মাটির প্রদীপ থেকে বাংলার পুতুল, ঐতিহ্য আঁকড়ে টিকে আছে মুর্শিদাবাদের কাঁঠালিয়া

মধ্যবঙ্গ নিউজ ডেস্ক, ৬ নভেম্বরঃ বহরমপুর থেকে ৩৪নং জাতীয় সড়ক ধরে  এগিয়ে গিয়ে উত্তরপাড়ার মোর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার গেলেই পরবে মুর্শিদাবাদের অন্যতম ঐতিহাসিক এবং শিল্প সমৃদ্ধ গ্রাম কাঁঠালিয়া। যার ঠিক ৩ কিলোমিটার আগেই অবস্থিত প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ। অর্থাৎ ইতিহাসের পাতায় একটি বিশেষ স্থান রয়েছে এই গ্রামের। গ্রামে প্রবেশ করা মাত্রই আপনাকে স্বাগত জানাবে পিচ গলা রাস্তার ধারে জমে থাকা কাদার স্তুপ।

মনে হবে এই পিচের রাস্তার ধারে এত কাদা মাটির কী কাজ? আসলোই বা কোথা থেকে। খানিকটা ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পরবে সারি সারি সাজানো মাটির প্রদীপ থেকে শুরু করে মাটি থেকে তৈরি হওয়া অন্যান্য জিনিষ। আপনি চলে এসেছেন মুর্শিদাবাদের কাঁঠালিয়া গ্রামে। মনে পরে যাবে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝায় করা কলসি হাড়ি’। ঠিকি গোটা পাড়াটাই আসলেই কুমোর পাড়া।

গ্রাম শুনলেই যে ছবি প্রথম মাথায় আসে তার সাথে হয়ত পুরোটা মিল খাবে না। সাটুই চৌরিগাছা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ১৮ নম্বর সংসদ কাঁঠালিয়া গ্রাম। বহরমপুর থেকে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। এবং ঠিক গ্রামে ঢোকার আগেই পরে প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ। এবং সেখানে খুঁড়ে পাওয়া যায় মাটির পুতুল এবং বিভিন্ন অন্যান্য জিনিষও। অর্থাৎ এই গ্রামের ইতিহাস যে বেশ পুরনো সেটি এখান থেকেই বোঝা যায়। এই গ্রামের প্রতিটা বাড়িতেই রয়েছেন মৃৎশিল্পী। যারা সাধারণ মাটিকে সেনে, তারপর সেই মাটি ইলেকট্রিক চাকের ওপর বসিয়ে সময় ধরে রূপ দিয়ে চলেছেন নানান মাটির জিনিষের।

কালের নিয়মে কাজের ধারাও বদলেছে। তবে বদলায়নি ঐতিহ্য। এই গ্রামের মানুষ মাটির জিনিষ বানানোটাকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আজও বাংলার ঘরে ঘরে যে মাটির প্রদীপ জলে। বা যে সমস্ত মাটির জিনিসপত্র দেখা যায়, তা এই মৃৎশিল্পীদের হাতেই বানানো। গ্রামের প্রতি ঘরেই রয়েছে ছোট-বড় কারখানা। বংশানুক্রমে পরিবারের সদস্যরা মিলে সকাল থেকে শুরু করে বেলা পর্যন্ত কাজ করেন সেখানেই।

সাধারনত পলি মাটি দিয়ে বানানো হয় এবং ভাগীরথী নদীর পার থেকে সহজেই পাওয়া যায় এই মাটি। ১২০০ টাকা প্রতি ট্রাক হিসেবে এই মাটি কেনা হয়। তারপর তাকে জল দিয়ে পা দিয়ে সেনে চাপানো হয় ইলেকট্রিকের চাকের ওপর। এবং ধীরে ধীরে দেওয়া নানান রূপ। রোদে শুকিয়ে এবং আগুনে পুড়িয়ে বানানো হয় অন্তিম প্রোডাক্ট। এই শিল্পীদের কাজ সারাবছর খুব একটা থাকেনা। অপেক্ষায় থাকতে হয় এই উৎসবের মরশুমের জন্যে। ফলে প্রদীপের নীচে কিন্তু অন্ধকার থেকেই যায়।

এই অন্ধকার দূর করার জন্যে সরকারের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করছেন নবীন থেকে প্রবীণ মৃৎশিল্পীরা। কারণ মানুষের চাহিদা কমে গিয়েছে মাটির জিনিষের প্রতি। এই মত অবস্থায় সরকার যদি এই সমস্ত সামগ্রীর  একাংশ কেনার ব্যবস্থা করেন তাহলে উপকৃত হবেন বলে জানান এখানকার শিল্পীরা। এই জীবিকায় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের আনাগোনা কিন্তু তাও নানান উপায়ে ধরে রাখতে চাইছেন এই নতুন প্রজন্মকে। বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন এই শিল্পকে। কিন্তু সমস্ত ঝড় কাটিয়ে ফিরছে মাটির জিনিষের চাহিদা। মানুষ পুনরায় ফিরছেন মাটির থালা-বাটিতে বলে দাবী করছেন প্রবীণ মৃৎশিল্পী সাধন পাল। ফলে সারাবছর আর চিন্তায় কাটাতে হচ্ছেনা শিল্পীদের।