বাংলাদেশই ভরসা! সীমান্তে আটকে ইলিশ।

ঋত্বিক দেবনাথ, বহরমপুরঃ এপার বাংলা হোক কিংবা ওপার বাংলা দুই দেশের মানুষেরই প্রাণ আটকায় ইলিশের কাঁটায়। ইলিশের সাথে বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসা এতটাই জড়িয়ে যে আগের বছর ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৯০০ মেট্রিক টন ইলিশ আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষমেশ এসে পৌঁছায় ১৩০০ মেট্রিক টন। এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে এসে পৌঁছায় ১২০০ মেট্রিক টন।

কিন্তু চাহিদা অনেক্ষানি কিন্তু আমদানি সেই মতন না হওয়ায়। ভারতীয় বাজারে ইলিশ মরশুমে ইলিশের ঘাটতি দেখা যায়। দামের দিক থেকেও ইলিশের প্রতি কেজি দাম হয়ে যায় প্রায় ১৩০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত। মাছে ভাতে বাঙালির দাম শুনে ইলিশ না খাওয়ার মতন পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু ইলিশের মালাইকারি, ভাপা ইলিশ, সরষে ইলিশ এবং অন্যান্য হরেক রকমের ইলিশের পদ খেতে বাঙালিকে কেও আটকাতে পারেনা।

এই বছর বাংলাদেশ থেকে খাতায়-কলমে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৯৫০ টন ইলিশ এ দেশে রফতানি হওয়ার কথা দিয়েছিল ঢাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই মেয়াদ ১১ অক্টোবরই ফুরিয়ে যাচ্ছে। বছরের কিছু কিছু সময় যেহেতু ইলিশ মাছের ডিম পাড়ার মরশুম হয়, সেহেতু সেই সময়গুলিতে বাংলাদেশ সরকার ইলিশ মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রাখে।

যেহেতু বছরের এই সময়টা মাছেদের ডিম পাড়ার মরশুম তাই বাংলাদেশ সরকার ১২ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের জন্যে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এমনিতেই মাত্র ৪০ দিনের মেয়াদে ৩৯৫০ টন ইলিশ এ দেশে পাঠানো অসম্ভবই ছিল। সেই সঙ্গে ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ইলিশ ধরা বন্ধ করে দিল। এমনটাই জানা যাচ্ছে ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া যা বোঝা যাচ্ছে, ১৪ অক্টোবর মহালয়ার আগেই পদ্মার ইলিশ ঢোকা বন্ধ হয়ে যাবে এমনটাই আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুজোর দিনগুলিতে ইলিশের ঘাটতির সম্মুখীন হতে পারে আমবাঙালির।

বাংলাদেশ পারে, কিন্তু কেন পারছে না পশ্চিমবঙ্গ। এই প্রশ্নের সন্ধান করলে জানা যাবে, সত্তরের দশকে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে গঙ্গা অববাহিকায় বাংলাদেশ থেকে ভারতের এলাহাবাদ পর্যন্ত বিচরণ ছিল ইলিশের। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির পর থেকে ইলিশের চলাচলের পথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। ইলিশ আর সেইভাবে ভারতে আসেনা।

২০১৯ সালে ভারতে ইলিশ মাছ প্রবেশের জন্য নতুন ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছিল ফারাক্কা বাঁধের নেভিগেশন লক। এ প্রকল্পে ৩৬১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা যায়। বর্ষাসহ ইলিশের প্রজননের তিন মৌসুমে যেন ভারতে জাটকা ঢুকতে পারে, সে লক্ষ্যে বিশেষ ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছিল এই লক সিস্টেম। এটিকে ইলিশ করিডর করার ভাবনায় করা হয়েছিল। কথাছিল ২০২১ এর জুন মাসের মধ্যেই খুলবে এই লক।

২০২২ সালে তখনকার তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যমন্ত্রী অখিল গিরি উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন ‘নোফিমা’ প্রকল্পের। যেখানে রাজ্যের সমস্ত পুকুরগুলিতে চাষ করা যাবে ইলিশের। প্রকল্পের‌ জন্য প্রাথমিকভাবে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার কাছে গঙ্গাপাড়ের কয়েকটি পুকুরকে বাছাই করা হয়েছিল। পুকুরে ইলিশ চাষের চেষ্টা বাংলায় আগেও হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি দু’তরফেই। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (আইসিএআর)-এর তত্ত্বাবধানে ব্যারাকপুরে ‘সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিসারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। ১০০ গ্রামের বেশি বড় করা যায়নি ইলিশের পোনাকে।

এমনই নানান প্রকল্প বা ভাবনার সাথে রাজ্য সরকার থেকে কেন্দ্রীয় সরকার আশা দেখিয়ে ছিল ইলিশ প্রেমিদের। অনেক টাকা বরাদ্দও করা হয় এই সমস্ত প্রকল্পগুলির জন্যে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বর্তমানে একটিও প্রকল্প কার্যকরী হয়নি। যার ফলে এখনও আমাদের বাংলাদেশ থেকে আগত ইলিশের ওপর নির্ভর করতে হয়। যার কারণে বাজারে দাম খুব বেশি থাকছে। অনেকটা পথ অতিক্রান্ত করে এই মাছগুলি আসে ফলে গুনগত দিকটাও কোথাও গিয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এবং আন্তর্জাতিক টানাপরা লেগেই থাকছে এই ইলিশ নিয়ে।