শীতের দুপুরে বইমেলা প্রাঙ্গণে পাঠকের মুখোমুখি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ঋত্বিক দেবনাথ, বহরমপুরঃ “আপনারা আমার থেকে কী শুনবেন সেটা জানিনা। কিন্তু এইটুকু বলতে পারি আমি একজন প্রশ্নাতীত মানুষ। খুব একটা সুখি মানুষ নই।” ছোট বেলা থেকেই সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন জাগে তাঁর। জীবন, মৃত্যু, বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড সবকিছু নিয়েই নানা ধরনের প্রশ্ন আসত মাথায়। সেই সব ভাবতে ভাবতেই একপ্রকার পাগল হয়ে যাচ্ছেন প্রৌঢ়। তাঁর কলমের আঁকিবুকি-পথ ধরে অনেকেরই শৈশব-কৈশোরের বন্ধু হয়ে উঠেছিল ভূতেরা। কয়েক বছর আগে এক প্রৌঢ় তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এক অভিজাত শপিং মল থেকে ফিরছিলেন। ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন আর এক ভদ্রলোক, ‘‘আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি! সিরিয়াল করেন, না?’’ প্রৌঢ় মৃদু হেসে জানান, ‘‘না, ইচ্ছে তো ছিল। কিন্তু এখনও সুযোগ পাইনি।’’

এই মজাদার প্রৌঢ়ই এবার মুর্শিদাবাদ জেলার বইমেলায় এসে পাঠক লেখকের দূরত্ব মিটিয়ে কথা বললেন সামনা-সামনি। কথা হচ্ছে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের। এবারের ৪৩তম জেলা বইমেলায় এসেছিলেন ৮৮ বছরের প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। পড়নে নীল রঙের পাঞ্জাবি নীচে ধূসর রঙের জিন্সের প্যান্ট। বয়সের ভারে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটছেন তিনি। কিন্তু মুখে একগাল হাঁসি। সবাই তাঁকে দেখা মাত্রই ছুটে এলেন প্রণাম করার জন্যে। পাঠকের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে উঠে গেলেন মঞ্চে। বইমেলায় তাঁকে দেখার জন্যে জড়ো হয়ে ছিলেন কয়েকশো পাঠক। এবং পাঠকের সামনে বসেই প্রথমেই তিনি বললেন, “কিছু বছর আগে আমাকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু পথ ভুলে আমার আসতে দেড়ি হয়ে যায়। এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারিনি। তার লজ্জা আমার রয়েছে। তারই প্রায়শ্চিত্ত করতে এত বছর পর আসলাম।”

হঠাৎ মনে হল জেলার ছেলে না হয়েও, এই জেলার প্রতি একটি আলাদা ভালোবাসা রয়েছে তা বোঝা গেল। বড়রাও তাঁর লেখায় প্রথম থেকেই খুঁজে পেয়েছে বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ‘ঘুণপোকা’কে। এইদিন শীর্ষেন্দু তাঁর ছোটবেলায় ফিরে যান। এবং বলেন, “বিষণ্ণতা আমাকে ছোটবেলা থেকেই আক্রান্ত করে আসছে। সেখান থেকে বাঁচার জন্যে মায়ের আঁচলের নীচে লুকাতাম। বারবার প্রশ্ন জাগে এই সংশয় কী আমার একারই হয়?”

ছোটবেলার কথা বলতে বলতে একটু থামলেন কিছু মাথায় চলছিল উনার। জলটা খেয়ে বললেন, “ছোটবেলা থেকেই আমি বাবাকে খুব ভয় পেতাম। চোখে চোখ রেখে কথাই বলতে পারতাম না। কিন্তু যেদিন বাবা মারা গেলেন। সেদিন শ্মশানে বাবার ঠাণ্ডা কপালে হাত রেখে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা তোমাকে যে কতটা ভালোবাসতাম তা টের পেয়েছিলে কখনও? জানিনা সেই ঠাণ্ডা কপাল কি উত্তর দিয়েছিল?”

মাস্টার্স করতে করতে লেখা শুরু করেছিলেন। তারপর আর কেও তাঁকে থামাতে পারেননি। সেদিন বাবার ঠাণ্ডা কপাল উত্তর না দিলেও সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে তাঁর পাঠকেরা খুব ভালোবাসেন। তা আজকের বইমেলায় পাঠকের জন জোয়ার দেখেই বোঝা গিয়েছে ।