ধ্বংসের কিনারে এমসিইটি, কলেজ নজর টেনেছে জমি মাফিয়াদের

নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুরঃ ফের সংবাদ শিরোনামে এমসিইটি। জেলার সবচেয়ে পুরনো বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এমসিইটি বা মুর্শিদাবাদ কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। সেই কলেজে লাটে উঠেছে পড়াশোনা। বকেয়া শিক্ষকদের ১৯ মাসের বেতন। সেই দাবিতে মঙ্গলবার রেজিস্ট্রারকে ঘিরে বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা।  তাঁদের দাবি, রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ দাস তাঁর নিজের ও ওই কলেজে কর্মরত তাঁর স্ত্রীর বেতন বেড়েছে, আর তাঁদের বেতন বৃদ্ধি তো দূর অস্ত আগের বেতনই দেয়নি কলেজ কতৃপক্ষ। যদিও তা অস্বীকার করেন বিশ্বজিৎ। তিনি বলেন, “ আমি বেতন দেওয়ার মালিক নই। আমি শুধু সিগনেচার অথরিটি।”সহকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে পরে অবশ্য কলেজ ছেড়ে পালান রেজিস্ট্রার। অবাক কাণ্ডে স্তম্ভিত জেলার শিক্ষাবিদরা।

দীর্ঘদিন ধরেই এই কলেজ নিয়ে উঠছিল প্রশ্ন। আসছিল একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। এমনকি জমি মাফিয়াদের নজরে পড়েছে প্রায় তিনশো বিঘার এই বেসরকারি কলেজ, এই অভিযোগও উঠেছে কলেজের অন্দরে।

মুর্শিদাবাদ জেলার ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারং পড়ার সুযোগ করে দিতে তৈরি হয়েছিল এই কলেজ। ১৯৯৭ সালের ৭ নভেম্বর সেই উদ্দেশ্যে তৈরি  হয় “ সোসাইটি ফর মুর্শিদাবাদ কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি”। ১৯৯৮ সালের ৮ অগস্ট কলেজ উদ্বোধন করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী  অসীম দাশগুপ্ত।  ২০০১ সালের ৪ আগস্ট কলেজের নতুন ভবন উদ্বোধন করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২০০২ সালের ২৮ এপ্রিল সোসাইটির নাম পরিবর্তন করা হয়। নতুন নাম হয় “ মুর্শিদাবাদ কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনলজি অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট। সেই এমসিইটি’ই এখন না কি দুর্নীতির আখড়া। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকশো ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ।

বিতর্কের শুরু ২০১৯ সালে। কলেজ কার? তাই নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। ২০১৯  সালের ২৪ অক্টোবর- এমসিইটি’র ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাম্পাসে বসে তৎকালীন জেলা পরিষদের সভাধিপতি মোশারফ হোসেন দাবি করেন, এই কলেজ মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের। যদিও তা নাকচ করেন কলেজের পূর্বতন পরিচালন সমিতির সদস্যরা। তাঁরা দাবি করেন, বেআইনিভাবে  কলেজ দখল করেছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতিই।

২০১৯ থেকে ২০২৩, বিতর্ক চলছেই।  তবে এসবের মাঝখানে ভাঙতে থাকে কলেজ। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের বেতন হয়ে গেল অনিয়মিত। বকেয়া পরে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও। শিকেয় ওঠে পড়াশোনাও।  তবে কলেজ কার? মেলেনি উত্তর। চলছে আইনি লড়াই।  বাকি ছিল  শিক্ষকদের ১৯ মাসের বেতন।  এর মাঝেই অভিযোগ  উঠেছে, জেলা পরিষদের  তৎকালীন  সভাধিপতি মোশারফ হোসেনের ব্যাক ডেটে  স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে বেড়ে গিয়েছে বর্তমান রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত দাসের  মাইনে। অভিযোগ ওঠে কলেজ থেকে  নানা অছিলায় লক্ষ লক্ষ টাকা অগ্রিম নিয়েছেন বিশ্বজিত, যার কোন ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেটই দেওয়া হয় নি। শুধু বেতন সংক্রান্ত অভিযোগই নয়। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের জমি রিয়াল এস্টেট কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্তও। সম্প্রতি কলেজের প্রিন্সিপাল নিয়োগ নিয়েও এসেছে অনিয়মের অভিযোগ। ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাম্পাস দখলের পর কাশিমবাজারে কলেজের বিবিএ-বিসিএ ক্যাম্পাস দখল করতে মাঠে নেমে পরেন বিশ্বজিত। আর তা করেছেন পরিচালন সমিতির সদস্যদের অন্ধকারে রেখেই, দাবি তাঁদের। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন বিশ্বজিৎ। তবে কার স্বার্থে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জেলার অন্যতম পুরোনো বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে? এর পিছনে কারা ? শিক্ষার মন্দির ঘিরে কেন ক্ষমতা দখলের লড়াই?  কিসের স্বার্থে? শিক্ষাঙ্গনে কি নজর জমি মাফিয়াদের?  উঠছে প্রশ্ন। এত বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমির প্রতি ব্যবসায়ীদের লোভই কি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কলেজকে! এরকম চলতে থাকলে কীভাবে বাঁচবে এমসিইটি? প্রশ্ন কলেজ পড়ুয়াদের। কলেজের বর্তমান পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।