বন্ধ ইট ভাটা, নেই স্কুলও; কী হবে ওদের ? ইট ভাটায় কেমন কাটে দিন ?

দেবনীল সরকারঃ বহরমপুর  শহর থেকে একটু দূরে ফাঁকা জায়গায়, দিকে দিকে ছড়িয়ে আছে ইটের ভাটা। ইট ভাটাগুলোতে বছরে ৪ – ৫ মাস (কোনও বছর ৬ মাসও) ইট প্রোডাকশনের কাজ হয় । সেখানেই  দল বেধে কাজ করেন স্ত্রী পুরুষ সকলে । শ্রমিকেরা অনেকেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের  । মাটি তোলা, মাটি থেকে ইটের আকার দেওয়া, ইটকে চিমনিতে পড়ানো – এসবই করতে হয় । শ্রমিকরা  ইটভাটাতেই থাকেন । সেখানেই  ঘর সংসার। বাইরের রাজ্য ঝাড়খন্ড থেকেও অনেক পরিবার আসেন ইটভাটায় কাজ করতে । ইটের প্রোডাকশনের সময় সেখানে ২০-৩০ টি পরিবার একসাথে থাকেন ইটভাটার এলাকাতেই। ভাটার পক্ষ থেকেই থাকার জায়গা দেওয়া হয় ।  সেখানে ঘর তৈরি করে থাকেন তাঁরা। বছরে কমবেশি প্রায় ১৫ লক্ষ ইট তাঁরা নিজের হাতে   তৈরি করেন।

কাজ নেই। ফাঁকা ধূ ধূ করছে ইটভাটা চত্ত্বর। ছবিঃ ময়ূরেশ রায়চৌধুরী

প্রায় ৫০ -৬০ জনের একটি ছোট্ট গ্রামের রূপ নেয় ইটভাটাগুলি। কিন্তু এই বছর এখনও শুরু হয়নি ইটের প্রোডাকশন। শোনা যাচ্ছে, সব ঠিক থাকলে হয়তো নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে কাজ শুরু হতে পারে, ইটভাটা কতৃপক্ষের তরফ থেকে এমনটাই জানানো হচ্ছে।এই সময়ে কাজ থাকে না। তাই, শ্রমিকরা অধিকাংশই নিজেদের দেশে চলে যান। কাজ শুরু হলে আবার ফিরে আসেন ইটভাটায়। তবে যাঁরা এখন ইটভাটায় আছেন, যাঁদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই ইটভাটাই তাঁদের দেশ। কী অবস্থায় আছেন সেই শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার? কি খাচ্ছেন? কেমন আছেন সেখানকার বাচ্চারা?

ইটভাটায় ঘরবাড়ি। ছবিঃ ময়ূরেশ রায়চৌধুরী

তবে এখন কাজ নেই। ফাঁকা ধূ ধূ করছে ইটভাটা চত্ত্বর । এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ট্রাক্টর, মাটিখোঁড়া মেশিন । দূরে কুঁড়েঘরে কেউ চাপিয়েছেন রান্না, শুধু ভাত ফুটছে হাড়িতে । নেই তেমন পুষ্টিকর খাবার । ছোট ছোট দুটো বাচ্চা ধুলোর মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে । গাছতলায় বসে একটি ছোট্ট শিশু, এখনও হাঁটতে শেখেনি ও । ওর মা অঞ্জলী ।  আজ প্রায় ৫ বছর ধরে ইটভাটায় কাজ করেন  ওই  শ্যামবর্ণা শ্রমিক। এখানেই প্রেম করে বিয়ে করেছেন  দূর জেলার শ্রমিক বরুণ দাসকে। তিন বছরের, ছয় বছরের ও আট বছরের তিনটি ছেলে আছে অঞ্জলীর।

৫ বছর ধরে ইটভাটায় কাজ করেন অঞ্জলী। ছবিঃ ময়ূরেশ রায়চৌধুরী

এখন প্রোডাকশন বন্ধ তাই ইটভাটার মালিকের কাছ থেকে টাকা ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে । যা পরে সুদ সমেত ফেরত দিতে হবে। এই প্রথাকে বলে দাদন । দাদন একটি প্রাচীন প্রথা । এই প্রথায় মালিকরা শ্রমিককে টাকা ঋণ দেন । পরে কাজের মজুরি থেকে সেই টাকা পরিশোধ দিতে হয় । অঞ্জলী বলেন, এই সময়টা বড্ড কষ্টে কাটে ।  ভাত ফুটিয়ে শাক দিয়ে পেট চলে কোনওরকমে । আট বছরের ছেলে পল্টু স্কুলে যায় না। হতে হয় বলে হতে ভর্তি হয়েছে, কিন্তু যেতে হয় না । বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে স্কুল পাউন্ডরোড প্রাইমারি স্কুল, ফলে বাহানা সব সময় প্রস্তুত – ‘স্কুল মেলা দূরে’ । এখানে রয়েছে পল্টুর বয়সী আরও বাচ্চারা। স্কুল দূরে বলে যায় না তারা।  সারাদিন যখন ওদের মা – বাবা ইটভাটায় কাজ করে, তখন ওরা মাটি মেখে ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক।

কাজ নেই। ফাঁকা ধূ ধূ করছে ইটভাটা চত্ত্বর। এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ট্রাক্টর, মাটিখোঁড়া মেশিন । ছবিঃ ময়ূরেশ রায়চৌধুরী

তিন ছেলেকে নিয়ে সংসার করছি এই ইটভাটায় আজ প্রায় ৫ বছর । এই সময়টা কোনও বছরই কাজ থাকে না দাদন নিয়ে চালাতে হয়। পুজোর সময় যখন সবাই আনন্দ করে তখন আমাদের কোনওরকমে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়।  যতদিন না কাজ শুরু হচ্ছে ততদিন এভাবেই চলবে।  মালিক তরফেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এতদিন ধরে।  বারবার দাদন চাইলেও কড়া শুনতে হয় । আমাদের এই সমস্যা চিরকালীন। কোনওদিনও সমাধান হবে না অসহায় হয়ে, বলেন অঞ্জলী দাস।