কেরালার হাসপাতালে হরিহরপাড়ার শ্রমিকের লাখ লাখ টাকার বিল ! বেপাত্তা ঠিকাদার।

নিজস্ব সংবাদদাতা, ৯ নভেম্বরঃ ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয় শ্রমিককে। বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সুস্থ হলেও এখন কপালে চিন্তার ভাজ পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারে। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মোটা টাকার বিল ধরানো হয়েছে। স্বামী সুস্থ হলেও বাড়ি ফিরিয়ে আনতে এতো টাকা পাবেন কোথায় তা নিয়ে কপালে চিন্তার ভাজ হরিহরপাড়ার পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারে।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, হরিহরপাড়া আব্দুলপুর গ্রামের বাসিন্দা আজিনুল সেখ তিন মাসে আগে কেরালায় কাজে যায়। গত ১লা নভেম্বর কাজ করার সময় ছাদ থেকে পরে গুরুতর জখম হন। তাঁকে প্রথমে সরকারি হাসপাতালে এবং পরে সেখান থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে আজিজুর সুস্থ হয়ে উঠেছেন। শুক্রবার তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হবে। তবে হাসপাতালে মেটাতে হবে মোটা টাকার বিল। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের পক্ষ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা পাবেন কোথায়। এখন স্বামীকে ফিরে পেতে সরকারি সাহায্যের দিকেই তাকিয়ে পরিবার।

আজিনুলের পরিবারে রয়েছে স্ত্রী ও তিন সন্ধান। বড় মেয়ে নবম শ্রেনীতে পরে, তবাকি দুজন ছোট। বাবার পাঠানো টাকায় চলতো সংসার থেকে পড়াশোনা। তবে দুর্ঘটনায় পর বাবাকে ফিরে পেতে প্রয়োজন লক্ষ লক্ষ টাকা। তাঁর সন্তানরাও পথ চেয়ে বসে আছে বাবার। পরিযায়ী শ্রমিক আজিজুরকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে কিছু টাকা জোগার করেছেন, তবে তা দিয়ে আর কি হবে। বেরসকারি হাসপাতালে মোটা টাকা বিল মেটাতে সাহায়ের দিকেই তাকিয়ে প্রতিবেশীরাও।

কেরালার বেসরকারি হাসপাতালের বকেয়া বিল। যেখানে স্পষ্টত লেখা ‘সেল্ফ পে’।

পেটের দায়ে মানুষকে কিনা কি করতে হয়। কখনও তার নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে দীর্ঘদিন বাইরে পরে থাকতে হয়। আবার কখনও নিজের সমস্ত ইচ্ছেকে মেড়ে সংসার চালানোর দায়ে গাধার খাটনি খাটতে হয়। এমনই কিছু দৃশ্য হরদম দেখা যায় মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের। বিশেষত পরিযায়ী শ্রমিকদের। কী আর করবে। সংসারে দায়িত্ব যখন মাথার ওপর পরে তখন নিজের চিন্তা না করেই নেমে পরতে হয় ময়দানে। মুর্শিদাবাদের হাজারো হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ একটু বেশি টাকা রোজগারের আশায় পারি দেন ভিন্‌ রাজ্যে অনেক আবার পারিদেন ভিন্‌ দেশেও।

২০১১ সালের পর বারবার সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে বর্তমান পরিযায়ী শ্রমিকের সঠিক পরিসংখ্যান। সেই নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে অনেকদিন ধরে কেস চলছে বলে অভিযোগ। ২০১১ সালের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ছ’লক্ষ, অসরকারি মতে এখন ওই সংখ্যা হবে সত্তর লক্ষ থেকে এক কোটি। ধোঁয়াশায় পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকের পরিসংখ্যান। যদিও পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যে কর্মসাথী অ্যাপ বা পোর্টাল চালু করেছে রাজ্য সরকার।

এই অ্যাপে বা পোর্টালে নিজেদের রেজিস্টার করলে ভিন্‌ রাজ্যে বা দেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের জন্যে নানান সুবিধা রয়েছে। যদি কোন পরিযায়ী শ্রমিকের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে তাহলে তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক ৫০ হাজার টাকা পাবেন এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে পাবে ২ লক্ষ করে টাকা। এছাড়াও দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতার ক্ষেত্রে পাবে ১ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে আপাদকালীন পরিস্থিতিতে জরুরী সহায়তা।

পোর্টাল বা অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের অসুবিধার কথা ফোনেই রেকর্ড করে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া যাবে কাছের মানুষকে। কর্মবিয়োগ কিংবা মজুরি সংক্রান্ত যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায়। বাইরে গিয়ে দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু হলে সেই শ্রমিকেরে মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার জন্য নমিনিকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে এবং সৎকারের জন্য পাবে ৩ হাজার টাকা।

এখনও পর্যন্ত প্রায় চোদ্দো লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। নভেম্বরের গোড়ায় তালিকা যাচাইয়ের কাজ শুরু হবে বলে জানা যাচ্ছে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে। যদিও পরিযায়ী শ্রমিককে ফেরাতে উর্ধোতন কতৃপক্ষের সাথে কথা বলা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিডিও। এখনও  আজিজুর সেখ কবে কেরালা থেকে ফেরে সেদিকেই তাকিয়ে গোটা পরিবার।

পশ্চিমবঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকের নথিভুক্তি চলছে, যাতে তাঁরা সরকারি অনুদান পেতে পারেন। কিন্তু শ্রমিকদের অধিকারের সুরক্ষার জন্য ঠিকাদারদের নথিভুক্তিই বেশি জরুরি ছিল না কি? আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আইনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মজুরি, অন্য রাজ্যে কাজ করার জন্য ভাতা, বাড়িতে যাতায়াতের ভাতা, কর্মক্ষেত্রে বাসস্থান, নিখরচায় চিকিৎসা, চুক্তি শেষে সমস্ত প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া, এই সবই ঠিকাদারের দায়িত্ব। প্রত্যেক শ্রমিককে ছবি-সহ পাসবই দেবেন ঠিকাদার, সেখানে উল্লেখ থাকবে, কোথায়, কবে থেকে কাজ করছে ওই শ্রমিক, কত মজুরি প্রাপ্য হচ্ছে, ইত্যাদি।

কিন্তু বাস্তবে এই সমস্ত ঠিকাদাররা কোনভাবেই কোন আইননুসারে কাজ করেন না। তেমনই কিছু লক্ষ্য করা গেল মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার পরিযায়ী শ্রমিক আজিজুর সেখের সাথে। এত উঁচু  থেকে পরে যাওয়ার ফলে তার যে ক্ষতি হয়েছে অনেকটাই তার দায়িত্ব নিতে নারাজ তার ঠিকাদার। হাসপাতালের বিলে স্পষ্ট লেখা ‘সেল্ফ পে’ অর্থাৎ নিজের টাকা নিজেকেই মেটাতে হবে। ইতিমধ্যে ৭ লাখ টাকার ওপর বিল হয়েছে তার মধ্যে এদিক সেদিক থেকে টাকা জমিয়ে প্রায় ২.৫ লাখ টাকা মেটানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বাকি এখনও ৪.৫ লাখ টাকা এবং আজকালের মধ্যে যদি এই বকেয়া বিল না মেটাতে পারে তবে বাড়বে বিলের পাহাড়। কীভাবে এত টাকার বিল মেটাবেন পরিবার তার থেকেও বড় প্রশ্ন সেই মানুষটাকে আনার পর সুস্থ রাখার যে লড়ায় চালাতে হবে সেটাই বা করে উঠবেন কীভাবে। তা নিয়ে কিন্তু থেকে যাচ্ছে একটি বিরাট সংশয়।