কালীকথাঃ শ্যামা নয় মুর্শিদাবাদের গোকর্ণে শ্যামরায় কালী নামেই পূজিত হন শক্তির দেবী।

ঋত্বিক দেবনাথ, বহরমপুরঃ মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহরমপুর থেকে কান্দি মহুকুমার প্রায় ১৮ কিমি দূরে অবস্থিত একটি সুপ্রাচীন গ্রাম গোকর্ণ। জনশ্রুতি আছে প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্কের বিশালাকার গরুর গোয়াল ছিল এখানেই। সেখান থেকেই গ্রামের নাম করন হয় গোকর্ণ।

কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায়না এই গ্রামের সুপ্রাচীন ইতিহাস। এই গ্রাম, কালী গ্রাম নামেও খ্যাত। এক সময় এই গ্রামেই প্রায় ৮০-৯০টি কালী পুজো হত। বর্তমানে কমে গিয়ে ৪৮ টি মতো পুজো হয় বলে জানা যায়। আর এখানে কালী শ্যামাকালি নয় গোকর্ণের বিখ্যাত হচ্ছে শ্যামরায় কালী নামে পরিচিত। রায় বংশীয় সাধক ছিলেন শ্যাম। তাঁর নামনুসারেই কালির নাম শ্যামরায়। শ্যামাচরণ রায় প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে দেবী সারা বছরই বিরাজমান। দীপান্বিতা অমাবস্যায় এই বছর শ্যামরায় কালী পুজোয় উপস্থিত হয়েছেন বহু মানুষ।

লোক মুখে প্রচলতি জমিদার হট্টেশ্বর রায় প্রথম এই গ্রামের পূর্বদিকে দারকা নদীর শাখা নদীর পাশেই ঘুষকুরো পুকুরের ধারে হট্টেশ্বর শ্মশান কালির প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই ঐ কালী হট্টেশ্বর কালী নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু গ্রামের বাইরে দেবীর বেদি থাকার কারণে সেটি কোনোভাবে অচ্ছুৎ হয়ে যায় এবং তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নাদেশ দেন হট্টেশ্বর রায়-এর বংশধর শ্যামাচরণ রায়কে। সেই থেকেই এই গ্রামে দেবী শ্যাম রায় দক্ষিণা কালী নামে পূজিত হন।

কথিত আছে, প্রায় ২০০ বছর আগে জমিদার শ্যামাচরণ রায় প্রথম এই কালী পুজোর শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখানেও লুকিয়ে গল্পের আরও একটা প্যাঁচ। দীর্ঘদিন ধরে নিঃসন্তান ছিলেন কারণ যখনই কোন সন্তান হত তাঁদের বেশিদিন বাঁচত না।

এবং তখন সবাই মতামত দিল শ্রী শ্রী বামাখ্যাপার সাথে দেখা করতে তিনিই একমাত্র এই রায় পরিবারের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে পারবেন। সেই সময় বামাখ্যাপা ছিলেন তারাপীঠে। কিন্তু তারাপীঠ পৌঁছানোর আগেই দেখা হয় দেবীর পরম ভক্তের সাথে। দেখা মাত্রই এক অদ্ভুত নির্দেশ দিলেন জমিদার শ্যামাচরণ রায় কে। বলেন এবার যে সন্তান গর্ভে আসবে। তার জন্ম হওয়ার পর অন্নপ্রাশন-এর সময় প্রথম অন্ন একটি কুকুরকে খাওয়াতে হবে তারপর সেই প্রসাদ বাচ্চাকে খাওয়ালে সুস্থ থাকবে সেই বাচ্চা। এবং যেহেতু কুকুরের অন্ন খেয়ে অন্নপ্রাশন হয়, তাই সেই ছেলের নাম রাখা হলো কুকুর রায়।

মা এখনও ভক্তদের স্বপ্নে আসেন, মানত মেনে না পূরণ করলে মনে করিয়ে দেন। সেই কারণেই সারা বছর জুড়ে ভক্তদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতন। এবং কালী পুজোর সময় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় বারবার প্রমাণ করিয়ে দেয় যে মা এখানে কতটা জাগ্রত। দীপান্বিতা অমাবস্যায় গোকর্ণের শ্যাম রায় দক্ষিণা কালীর পুজোতে মানুষের ঢল থামছেই না। এবং এই গ্রামে কালী পুজো নিয়ে উৎসাহও চোখে পরার মতন।