শিশু শ্রম, শিক্ষার বঞ্চনার অবসান চাইছে পড়ুয়ারা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চাই সচেতনতা

কলকাতা, ২৪ নভেম্বরঃ শিশু শ্রম, শিক্ষা আর মানসিক স্বাস্থ্য ভাবাচ্ছে শহরের পড়ুয়াদের। সম্প্রতি একটি অনলাইন আলোচনার আয়োজন করেছিল ইউনিসেফ এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনাল । যেখানে মুখ্য আলোচক ছিল পড়ুয়ারাই। প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা ছাত্রচাত্রীদের নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে তারা।
এদিন আলচনায়ম এমসি কেজরিওয়াল বিদ্যাপিঠের ছাত্র চিরাগ তুলসিয়ান বলেছে, “ গ্রামে গিয়ে আমি দেখেছি, শিশুরা টাকার জন্য কাজ করছে। খরা ও অকালবৃষ্টির কারণে পরিবারে আর্থিক দুর্দশা নেমে এসেছে। বাধ্য হয়েই শিশুরা পড়া ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছে”।
এক মাস বাড়িতে ছিল চিরাগ। সেখানে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, স্কুলছুট এক শিশুকে পড়াবে যদিও এরপর আরও অনেকে যোগ দেয় । চিরাগ বলেছে, “ প্রথমে আমি রেন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ‘এর মূল বিষয়গুলো শেখাতে শুরু করি। যাতে করে তারা বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারে”। চিরাগ জানিয়েছে, এতে করে শিশুদের পড়াশোনাও হয় আবার অভিভাবকরাও খুশি হয়। এরপর যখন গ্রামে অসময়ে বৃষ্টি হয়েছে, শিশুরা এগিয়ে এসে তার মোকাবিলা করেছে।

অনলাইন আলোচনায় পড়ুয়ারা

আলোচনায় হরিনারায়ণ বিদ্যামন্দিরের ছাত্রী তপস্যা জৈন বলেছে, শিশুরা তাদের বাবা মায়ের সম্পত্তি নয়। শিশুদের দিয়ে টাকা রোজগার করানো যাবে না। এটা সবাইকে বুঝতে হবে।
তপস্যা এদিন নিয়ে এসেছিল নিজের হাতে তৈরী “স্টপ চাইল্ড লেবার” লেখা পোস্টার। সে বলেছে, “ শিশু শ্রম শিশুদের বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতনের শিকার করে তোলে। এতে তাদের পড়াশুনার দফারফা হয়ে যায়”।

চিরাগের উদ্যোগের কথা শুনে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের (WBCPCR) চেয়ারপার্সন সুদেষ্ণা রায় ছাত্রছাত্রীদের কাছে অনুরোধ করেছেন, বাড়িতে যারা কাজ করেন তাদের বাচ্চাদের যেন যত্ন নেয় পড়ুয়ারা । “রান্নার লোক, বাড়ির কাজের লোক অথবা গাড়িচালকের ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। এদেরকে শিশুদের ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলো,” তিনি বলেন।
আলোচনায় উঠে এসেছে ছাত্রছাত্রীরা মানসিক চাপের কথাও। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে, আহ্বান জানায় পড়ুয়ারা । ডিপিএস মেগাসিটি স্কুলের বাঞ্ছিত আগরওয়াল এদিন বলে যে জীবনে বেড়ে ওঠার সময় হতাশা তার সামনে যেন একটা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। পড়ুয়ার আবেদন, “”পড়াশুনার চাপ এবং শিশুদের সহায়ক কোনো শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশে এখনো নেওয়া হয়নি। অভিভাবকদের আমি তাদের সন্তানদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হতে আবদেন জানাচ্ছি এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করুন,”।

ছবিঃ প্রতীকী

রোটারি এবং ইউনিসেফ এই লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করবে বলে ঘোষণা করে, পশ্চিমবঙ্গের ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অমিত মেহরোত্রা বলেন, “সরকারি সংস্থাগুলির সাথে কাজ করার পাশাপাশি ইউনিসেফ বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অন্য অনেক সংস্থার সাথেও কাজ করার চেষ্টা করছে। শিশুদের আরো উন্নতির জন্য তাদের মতামত নেওয়া জরুরি।”

এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা ছিলেন ইউনিসেফের কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ সুচরিতা বর্ধন । পড়ুয়াদের আলোচনায় তিনি বলেন, শিশুবিকাশের জন্য নীতি প্রণয়ন এবং তাদের নিয়ে আলোচনার সময় শিশুদের মতামতের গুরুত্ব অপরিসীম।
আলোচনায় উঠে এসেছে বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ও। আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক জয়ন্ত বসু সুন্দরবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী মানুষের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে শিশু অধিকার আয়োগের উপদেষ্টা অনন্যা চক্রবর্তীও উপস্থিত ছিলেন।
রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রাক্তন সভাপতি ও বর্তমানে এই সংস্থার ইন্ডিয়া লিটারেসি মিশনের মুখ্য উপদেষ্টা শেখর মেহতা বলেন যে শিশুদের আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করবে ইউনিসেফ এবন রোটারি ইন্টারন্যাশনাল।