প্রয়াত সাধন দাস বৈরাগ্য । সুর ও সাধনার এক যুগের অবসান ।

দেবনীল সরকারঃ “বাহ্ বাহ্ বাহ্ বাহ্ বাহ্!” এই শব্দবন্ধ যাঁরা সাধনের কণ্ঠে শুনেছেন তাঁরাই জানেন, কীভাবে একা বাউল শুধুই সহজ সাধন নয়, সঙ্গী-শিল্পীদের নিরন্তর উৎসাহ দিতে হয়, সঙ্গীদের কীভাবে বারবার চাঙ্গা করা যায় কথার জালে, সুরের আঙিনায়। সাধন দাস বৈরাগ্য, এই সময়ের বাউল গানের জগতে এক চর্চিত নাম। বর্ধমানের মুক্তিপুরে জন্মেছিলেন সাধন দাস বৈরাগ্য। প্রথমে বাউল গানের সাধনায় ঘুরে বেড়ানো শুরু নানান আখড়া, আশ্রম ঘুরে বর্ধমানের হাটগোবিন্দপুরে এবং পরবর্তী কালে আমরুন গ্রামে নিজের আশ্রম তৈরি করেন সাধন। সেখানেই রবিবার রাতে অসুস্থ অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন  আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শিল্পী সাধন দাস বৈরাগ্য।

১৯৯১ সালে বাউল গান গাইতে জাপান পারি দেন সাধন। সেই সফরের পর তাঁর অনুষ্ঠান বিশেষ খ্যাতি পায়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হয়ে ওঠেন বাউল শিল্পী সাধন দাস বৈরাগ্য। বাউল গানের সুর ও বাংলা মাটির টানেই জাপানের ওসাকা থেকে সে দেশের নাগরিক মাকি কাজুমি আসেন বাংলায়। এখানে এসে হয়ে ওঠেন সাধন দাসের ‘সাধন সঙ্গিনী’। বর্তমানে তিনিও সাধনের আমরুন গ্রামের আশ্রম ‘সদানন্দের হাট’ -এ থাকেন, তাঁদের বিরাট ভক্তকুলের সাথেই। সেখানে নিয়মিত হয় বাউল চর্চা। সাধন দাস বৈরাগ্যের এই আশ্রমে দেশ-বিদেশের প্রচুর শিল্পী আসেন, থাকেন বাউল গানের চর্চা করেন। তাঁদের বাউল পরিবেশন বিশেষ সমাদৃত। দেশ-বিদেশের বহু শিল্পী তাঁদের গানের ভক্ত। সাধন দাস বৈরাগ্যের টানে বিভিন্ন দেশর বহু নাগরিকই তাঁর শিষ্য হন। রবিবার রাতে সেই ‘সদানন্দের হাট’ ছেড়ে গৌরলোকে বিলীন হলেন এই নামজাদা বাউল সাধক।

অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের উদ্দেশ্যে ফুল ছেটাচ্ছেন সাধন দাস বৈরাগ্য। ছবি – দেবনীল।

এই তো সেদিনের কথা –

জাতপাতের বিভেদ ভুলে কোলাহলমুক্ত মুর্শিদাবাদের এক আমবাগানে হয়েছিল ‘ভাগীরথী বাউল ফকির উৎসব’। নবাবের ঐতিহাসিক শহর মুর্শিদাবাদে সেদিন বসেছিল এক চমৎকার আসর। এপ্রিল মাসের প্রথম দু’দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাউল গানের মাতাল সুরে মেতেছিল মুর্শিদাবাদবাসী। সেখানেই প্রথম চোখে দেখা সাধন দাস বৈরাগ্যকে। আর সেই শেষ। মাটির ওপর মাটির গান। কাঁচামাটির গন্ধ, নতুন আমের মুকুলের ঘ্রাণ, ধুনুচির ধোঁয়া, কাঁচা সুগন্ধির গন্ধে মম করছিল লালবাগের ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ পার্কের প্রাঙ্গণে। সেখানেই প্রথমবার দেখা আর ক্যামেরা বন্দী করা তাঁকে। দু’একটা বাক্য আদানপ্রদানও হয়েছিল কিন্তু তা খুবই ফিকে, বোকাবোকা। তবে সাধনের মুখ থেকে উচ্চারিত কথা ক্ষুরধার, শুনে যেন কানও ভাবতে শেখে। “বাহ্ বাহ্ বাহ্ বাহ্ বাহ্!” এই শব্দবন্ধ যাঁরা সাধনের কণ্ঠে শুনেছেন তাঁরাই জানেন, কীভাবে একা বাউল শুধুই সহজ সাধন নয়, সঙ্গী-শিল্পীদের নিরন্তর উৎসাহ দিতে হয়, সঙ্গীদের কীভাবে বারবার চাঙ্গা করা যায় কথার জালে, সুরের আঙিনায়।

ভাগীরথী বাউল ফকির উৎসবে মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন শিল্পীরা। ছবি – দেবনীল।

দর্শক হিসেবে এই প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন শহরের বিশিষ্টজন, সাংস্কৃতিক বোদ্ধারা তো বটেই, তবে মনের মানুষের কণ্ঠে মাটির গানের সুরে সাধারণ, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জীবনের একটি বিশেষ মোড়ে বা বাঁকের কথা বারবার উঠে আসছিল বাউল ফকিরদের তত্ত্ব গানে। এই গান মূলত ভাববাদী। ভাবের ঘরে বাস করে বোধ। বোধই আসলে মানুষকে পৌঁছে দেয় বুদ্ধি বা মোক্ষের দিকে। এ আলোচনা জটিল, কিন্তু বিষয় বড় সহজ। যাঁরা একথা বলছেন তাঁরা আরও সহজ, সাধারণ। তাঁদের জীবনবোধ শহুরে মানুষের থেকে ভিন্ন তো বটেই বরং উৎকৃষ্টও বলা চলে। এই কথায় নিজেদের গানে বারবার বুঝিয়েছেন সাধন দাস বৈরাগ্য সহ অন্যান্য বাউল শিল্পীরাও।

ভাগীরথী বাউল ফকির উৎসবের প্রবেশ পথ। ছবি – দেবনীল।

দেশ-বিদেশে অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানে বাউল গানের তালে মাতিয়েছেন সাধন। তবে গত এপ্রিলে মুর্শিদাবাদে হয়ে যাওয়া ‘ভাগীরথী বাউল ফকির উৎসব’ হয়তো ছিল বৈরাগীর জীবনের শেষ অনুষ্ঠান। ক্যান্সারসহ অন্যান্য বয়স জনিত রোগে ভুগছিলেন সাধন দাস বৈরাগ্য। শেষে রবিবার রাতে জীবন মৃত্যুর কাঁটাতার পেরিয়ে বিলীন হয়ে গেলেন এই বিখ্যাত বাউল শিল্পী।