AIDS DAY:স্থানীয় স্তরে সচেতনতাই প্রতিরোধ সম্ভব এইচআইভি

বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য, বহরমপুরঃ প্যাঁচানো একটি লাল ফিতে। কী এর মানে? রাস্তাঘাটে, টেলিভিশনে, খবরের কাগজ, হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লাগানো পোস্টার, সব জায়গায় দেখা যায় এই প্যাঁচানো লাল ফিতের ছবি লাগানো পোস্টার। কীসের চিহ্ন এই প্যাঁচানো লাল ফিতে? উত্তরের খোঁজে যেতে হবে পিছনে।

সাল ১৯৮১। বিশ্বব্যাপি মানুষ সাক্ষী ছিল নতুন অসুখের। চিকিৎসা বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছিল হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিইয়েন্সি ভাইরাস বা এইচআইভি। এই ভাইরাস সংক্রামক। এই ভাইরাসই অ্যাকুয়ার্ড ইমিউন ডেফিসিইয়েন্সি সিনড্রোম বা এইডসের মূল কারণ। এই অসুখে মানুষের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে আসে, বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়। সেই সময়ে এইডস আকার নিয়েছিল মহামারীর। ‘হু’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত প্রায় বিশ্বে ৪০ মিলিয়ানের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই অসুখে। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ও বর্তমানে যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরির প্রতীক এই প্যাঁচানো লাল ফিতে।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিনে সারা বিশ্বে পালিত হয় এইডস দিবস। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব এসেছে। আগের থেকে মৃত্যু ভয়ের সম্ভবনা অনেকাংশে কমেছে এইডস আক্রান্ত রোগীর। যদি ঠিক সময়ে সনাক্ত করা হয় এইচআইভি পজিটিভের তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে সে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব হলেও মানসিকভাবে সম্ভবপর হয়নি এখনও। তাই আজও ‘এইডস’ নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে যুব সমাজ। তাহলে কী কমে আসছে দিন? পুরোটাই একটা মিথ। ঝেড়ে ফেলুন লোকলজ্জা । নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে সচেতন হন। আর পাঁচটা রোগের সঙ্গে যেভাবে লড়াই করেন সেভাবেই লড়ুন এইডস-এর সঙ্গে, জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ এইচআইভি’র সঙ্গেও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থভাবে বাস করছেন। প্রতি দশজনের মধ্যে চারজনই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় খাতায় কলমে নেই, কিন্তু শরীরে আছে ভাইরাস এরকম মানুষেরা নিজেই জানেন না যে তাঁরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত। আর নিজের অজান্তেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন যত্রতত্র। সমস্যা সেখানেই। রয়েছে সচেতনতার অভাব। তাই এই বছর এইডস ডে’র থিম নির্বাচন করা হয়েছে ‘লেট কমিউনিটি লিড’ অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্য দপ্তরে না এই রোগের সচেতনতার বার্তা নিয়ে মানুষকে সচেতন করা হবে স্থানীয় স্তরে। দিনকাল বদলেছে। ঠিকমতো ওষুধ, পথ্য ও সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক একজন এইচআইভি আক্রান্তকেও স্বাভাবিক জীবন দিতে পারে, এতটাই এগিয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্র। সবকিছু জেনেও এখনও সুরক্ষা ছাড়া যৌনসম্পর্ক স্থাপনে নাছোড়বান্দা বহু মানুষই। আর তাতেই ঘটছে বিপদ। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ২৪ লাখ । দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আক্রান্ত রয়েছে। শীর্ষ তিনে রয়েছে মহারাষ্ট্র,অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক। ভারতে ২০২১ সালেই নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন আনুমানিক ৬৭ হাজারের কাছাকাছি।

কীভাবে হতে পারেন এইচআইভি পজিটিভ? এইচআইভি আক্রান্তের ব্যবহৃত সূঁচ কিংবা ব্লেড ব্যবহার করলে বা আক্রান্ত রোগীর সার্জিক্যাল ব্লেড কিংবা ইঞ্জেকশন নিডল ব্যবহার করলে সংক্রমণ হয়। প্রেগনেন্সির সময় আক্রান্ত মায়ের দেহ থেকে শিশুর দেহেও সংক্রমণ হতে পারে, যাকে বলে প্লাসেন্টাল ট্রান্সফার। ট্যাটু করা কিংবা বডি পিয়ার্সিংয়ের সময়ও অন্যের ব্যবহৃত সূঁচ ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। এছাড়াও অনিয়ন্ত্রিত যৌন সম্পর্ক তো বটেই।

এইচআইভি আক্রান্ত হলেই কি সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু? না। ধীরে ধীরে দেখা যেতে থাকে উপসর্গগুলি।
যদি কেউ এইচআইভি আক্রান্ত হন তাহলে ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই লক্ষণ গুলি দেখা যেতে শুরু করে । যেমন প্রাথমিকভাবে জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, ফুসকুড়ি, রাতের ঘাম দেওয়া, পেশীতে যন্ত্রণা, গলা ব্যথা, ক্লান্তি লাগা, লিম্ফ নোড ফোলা, মুখের আলসার হওয়া ইত্যাদি এই রোগের লক্ষণ। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের মধ্যে কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন যে তিনি এইচআইভি রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন,তাহলে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষা করার পর,পরীক্ষার ফলাফল জানতে হবে। এইচআইভি পজিটিভ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা শুরু করতে হবে। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে খবর, বর্তমানে সমকামি পুরুষদের এইচআইভি পজিটিভের সংখ্যা মহিলাদের তুলনায় বেশি। যার অনেকগুলি কারণ আন্দাজ করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছাত্র থেকে শুরু করে পরিযায়ী শ্রমিক এঁদের মধ্যে একাধিক সঙ্গীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের নজির দেখা যাচ্ছে জেলায়। যা আশঙ্কার। এছাড়াও নেশা একটি অন্যতম প্রধান কারণ। একই সিরিঞ্জ থেকে অনেকে ড্রাগস নেন, যার ফলে বেড়ে যায় সংক্রমণের সম্ভবনাও।

ডিসেম্বরের প্রথম সকালে শহর বহরমপুরে বেড়িয়েছিল এডস সচেতনতা নিয়ে র‍্যালি। সেই র‍্যালি থেকে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জানান, “এই নিয়ে সচেতনতা নিয়ে আমরা জেলার ব্লকে ব্লকে কাজ করছি। সব মানুষের কাছে পৌঁছে যাব একদিন। সেদিন খুব দূরে একটা এইচআইভি মুক্ত পৃথিবী থেকে।”