বহরমপুরে অনুষ্ঠিত হল ‘ সুনীতি কুমার বিশ্বাস স্মারক বক্তৃতা ‘

মধ্যবঙ্গ নিউজ ডেস্কঃ বহরমপুর কালেক্টরেট ক্লাবের প্রেক্ষাগৃহে রবিবার অনুষ্ঠিত হল সুনীতি কুমার বিশ্বাস স্মারক বক্তৃতা। পরিবেশ, সমাজ ও দেউচা পাঁচামি কয়লাখনির বাস্তবতা নিয়ে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে মুর্শিদাবাদ জেলা বিজ্ঞান মঞ্চ। এই আলোচনা সভার মূল বিষয় ছিল পরিবেশ সচেতনতা, সমাজ ও দেউচা পাঁচামি কয়লাখনির বাস্তবতা।
সুনীতি কুমার বিশ্বাস ছিলেন, মুর্শিদাবাদ জেলার জনবিজ্ঞান আন্দোলনের অন্যতম মুখ। উক্ত আলচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, দেশের জন বিজ্ঞান আন্দোলনের পথিকৃত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্ত্তী। দেউচা পাঁচামীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া আদৌ কী বিজ্ঞান সম্মত? এর ফলে কী পরিবেশগত কোনও প্রভাব পড়তে পারে? সেই বিষয়ে মঞ্চে আলোকপাত করেন তিনি।
অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, “ অনেকদিন ধরেই বীরভূম জেলার স্থানীয় মানুষ ও যারা বিজ্ঞান চর্চা করেন এবং এই সম্পর্কিত অনুসন্ধান মূলক যে সংস্থা গুলি আছে, তাদের নানা পরিসংখ্যান থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয়না যে দেউচা পাঁচামিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য যে পরিকল্পনা সেখানে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই পরিকল্পনার কোনও বৈজ্ঞানিক সম্মতি থাকা উচিত নয়।”
সেদিনের আলোচনায় অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছে, প্রথমত, কোনও জায়গায় এই কাজ (কয়লা উত্তোলন) করলে পরিবেশের ওপর তার কী প্রভাব পড়বে? অধ্যাপক চক্রবর্তী বলেন, “সেই বিষয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা চাই। সেই বিষয়ে মানুষের কাছে রিপোর্ট পৌঁছনো চাই। বিষয়টি গনমাধ্যমে আসা প্রয়োজন। কিন্তু এই বিষয়ে তাঁরা নিরবতা পালন করছেন।”
দ্বিতীয়ত, ওই কয়লা খনির ওপরে যে বহুমুল্য বেসল্ট পাথর আছে সেই পাথরের নীচে চারটি ভিন্ন স্তরে যে কয়লা আছে তার পরিমাণ, গুণমান, সেই কয়লা দিয়ে বানিজ্যিকভাবে সফলতা পাওয়া যাবে কী না – এসব জানতে গেলে যে প্রযুক্তি কাজে লাগানো দরকার; তার উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নেই এখানে। সেই বিষয়েও কয়লা উত্তোলনকারী ওই কর্পোরেট সংস্থা নির্বিকার। তাঁরা কোনও জবাব দিচ্ছে না, বলেন তিনি “এটা আমাদের একটা আশঙ্কা আর এই আশঙ্কার যথেষ্ট সত্যতা আছে যে, বেসল্ট পাথর নিয়ে বিকৃত বানিজ্য করবেন ওই কর্পোরেট সংস্থা। কয়লা নিয়ে কোনও আগ্রহই নেই তাঁদের। কারণ সেখানে লাভজনক কিছু হবে না।”
একটি রাজনৈতিক অনুসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “শুনলাম দেউচা পাঁচামিতে যারা আন্দোলন করছেন কোন একটা রাজনৈতিক দলের সাথে নাকি তাঁদের যোগ আছে। যারা আজ একথা বলছেন তাঁদেরই তো একসময় অন্য দলের সাথে নৈকট্য ছিল। সেই আত্মীয়তা কেন ভেঙে গেছে সেটা তারাই বলতে পারবেন।”
প্রসঙ্গত উঠে এসেছে দেউচা পাঁচামির আদিবাসীদের কথা। তাঁরা বলছেন, আমাদের এখান থেকে উৎখাত করার প্রয়োজন নেই। আমরা যে জল, মাটি, দারিদ্রতা নিয়ে আছি এভাবেই থাকতে চায়। দেউচা পাঁচামির মাটিতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিজেরা একজোট হয়ে সই করেছেন, ‘আমরা এখানে কয়লাখনি চাইনা’।
অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী সেদিনের মঞ্চ থেকে বারবার হুঁশিয়ারি দিতে চেয়েছেন, কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা যদি নিজেদের মধ্যে একাত্ম অনুভব করে, তাহলে যে সর্বনাশ হওয়ার কথা, আমাদের আশঙ্কা দেওচা পাঁচামিতেও আগামী দিনেও সেই সর্বনাশ হতে চলেছে।
মধ্যবঙ্গ নিউজের প্রতিনিধিকে পরিবেশের বর্তমান অবস্থা ও সেই বিষয়ে রাজ্য ও দেশের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে অধ্যাপক বলেন, “দেশ ও রাজ্য যারা চালান তাঁদের যদি পরিবেশ নিয়ে বিকৃত চিন্তাভাবনা থাকে তাহলে এরম পরিবেশবিরোধী, অবৈজ্ঞানিক কাজ দেশের ও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতে হবেই। ঘটনা প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদেও ঘটেছে এই ধরণের পরিবেশ নিধনের ঘটনা। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানো হবে, তাই লিচুর বাগানে বৈদ্যুতিক খুঁটি পুঁতে জীববৈচিত্র নষ্ট করা হয়েছে। সরকারী সম্মতিতেই দিনের পর দিন এই ধরণের কাজ হয়ে আসছে, বলেন তিনি।
এরকমই আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচিত হয় উক্ত আলোচনা সভায়। মুর্শিদাবাদ জেলা বিজ্ঞান মঞ্চ কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয় আলোচনা সভায় মানুষের উপস্থিতিতে আশার আলো দেখছেন তাঁরা। প্রতিবছরই ‘সুনীতি কুমার বিশ্বাস স্মারক বক্তৃতা’ র আয়োজন করতে চান তাঁরা।