প্রচার বিমুখ জীবনানন্দের প্রসারতা বহুমুখী

রাহি মিত্রঃ  ” সকলেই কবি নয় । কেউ কেউ কবি ; কবি – কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে , এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকিরণ তাদের সাহায্য করেছে । কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারেনা” ।  বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার পরিকল্পনা করেছিলেন , মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে । এই সূত্রে জীবনানন্দ তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন নাম ‘ কবিতার কথা ‘৷

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে তাঁকে । বুদ্ধদেব বসু নির্জনতম কবি বলেছেন । অন্নদাশঙ্কর রায় শুদ্ধতম কবি বলে ভূষিত করেছেন যার কবিতায় পরাবাস্তবের দেখা মেলে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি লেখক প্রাবন্ধিক  তিনি।

১৮৯৯ এর ১৭ ই ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ । রূপসী বাংলা বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ যেন কাল কে জয় করেছে জীবনানন্দের অন্যান্য আর সকল কাব্যগ্রন্থের মধ্যে৷। জীবদ্দশায় অসাধারণ কবি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও , তিনি তেমন খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি । তবে এর জন্য অনেকে তার প্রচারবিমুখতা তাকে দায়ী করে থাকেন । জীবনানন্দ ছিলেন বিবরবাসি মানুষ । তবে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতার একজন অমূল্য রতন হিসেবে স্বীকৃতি পান৷। এছাড়াও ইংরেজিতে তার উপর লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি আ পোয়েট অফ পার্ট নামে একটি গ্রন্থে । ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি সহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে । জীবনানন্দ দাশ যদিও একজন কবি হিসেবে তার একাধিক কাব্যগ্রন্থের জন্য সমধিক পরিচিত হয়েছেন , কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঁর লেখা যে বিপুল পান্ডুলিপি উদ্ধার হয়েছে , তার মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং ১০০ র বেশি গল্প রয়েছে ।

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা বই গুলির মধ্যে রয়েছে ক্লিনটন বি সিলি র লেখা অন্য জীবনানন্দ , লাবন্য দাস এর লেখা মানুষ জীবনানন্দ , জীবনানন্দ ও তাঁর কাল হরি শংকর দাসের লেখা প্রভৃতি । যদিও জীবদ্দশায় কথা সাহিত্যিক হিসেবে জীবনানন্দের কোন পরিচিতি ছিল না । ২০১৫ অবধি প্রকাশিত তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ২১’ এবং ছোট গল্পের সংখ্যা শতাধিক । প্রচারবিমুখ কবি নিভৃতে উপন্যাস ছোটগল্প লেখেন । এর মধ্যে একটিও প্রকাশ করে যাননি তিনি । কবিতা থেকে কথাসাহিত্যে তিনি তার পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা ছিলেন । স্বতন্ত্র ছিলেন সমসাময়িকদের থেকেও । প্রাবন্ধিক হিসেবে জীবনানন্দ কিন্তু তেমন কোনো মর্যাদা পাননি । তবে তিনি প্রবন্ধ – নিবন্ধ – আলোচনা -লিখেছিলেন যা প্রতিটি মৌলিক ভাবনারই পরিচায়ক । বিশিষ্ট প্রবন্ধগুলির গুলির মধ্যে কবিতার কথা , রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা , কবিতার আত্মা শরীর , দেশ কাল ও কবিতা , পৃথিবী ও সময় , যুক্তি জিজ্ঞাসা ও বাঙালি , শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজি প্রভৃতি ।