পরীক্ষা গৌণ, আলোচনায় নির্বাচনই মুখ্য সাগরদিঘিতে

স্নেহাংশু চট্টরাজ, মধ্যবঙ্গ নিউজঃ সাগরদিঘির উপনির্বাচনের হাওয়া কেড়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষার উত্তেজনা। রাত পোহালেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় নির্ধারিত হবে পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যত কোন দিকে গড়াবে। কিন্তু কার দখলে থাকবে এই বিধানসভা, তার লড়াই ২৭শে। সেই আলোচনায় মশগুল হাট বাজার। পরীক্ষা নিয়ে তেমন মাতামাতি নেই বড়দের। পড়ুয়ারাও তাল ঠুকছে সুযোগ মত সেই আলোচনায়।

আত্মমগ্ন জাতীয় সড়ক ধরে বহরমপুর থেকে সুকির মোড়ে পৌঁছলেই তা টের পাওয়া যাচ্ছে। সুকির মোড় থেকে সাগরদিঘি সাত কিলোমিটার দূরে। ঝকঝকে পিচের রাস্তা। রাস্তায় দৌরাত্ম নেই যানবাহনের। কিন্তু অহরহ বাইক, টোটো থেকে ছোট গাড়ি, বাসেরও চলাচল অবশ্য আছে সেই রাস্তায়।

সকলেই কৃষিজীবি কিংবা বিড়ি শ্রমিক নয়, কেউ কেউ চাকরিও করেন। কেউ থাকেন ভিন জেলায় কেউ ভিন রাজ্যে। বিত্তের নিরিখে মধ্য ও নিম্ন বিত্তের বাসস্থান এই সাগরদিঘি। সাগরদিঘির অন্দরে যেতে হয় মিল্কি, সামসাবাদ পেরিয়ে। ওই দুটি গ্রামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানেই বারো ক্লাস পাশ করে সাগরদিঘি কলেজ ছাড়াও জেলার এখান সেখানকার কলেজে ভর্তি হয় পড়ুয়ারা। মেধাবীদের কেউ কেউ কলকাতার নামী কলেজেও নাম লিখিয়েছে এই অজ গাঁ থেকে। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা কবীর লেট বললেন, “ দিন কেটে যায় সুখে দুঃখে। নূন্যতম মাসিক হাজার ছ’য়েক টাকা আয় হলেই খুশি।” সকলেরই আয় ছ’হাজার টাকা হয় মাসে? উত্তরে কবীর বলছেন, “ তা হয় না কি। যাদের হয় না তাদেরও ঠিক দিন চলে যায়। অভাব অভিযোগে আমরাই তো পাশাপাশি থাকি। তেমন অসুবিধা হয় না।” তিনি আরও বলেন, “ অভিযোগ করে কি সমাধান হবে? কাঁচা বাড়ি পাকা হবে? জব কার্ড হবে? যদি তা না হয় তাহলে অভিযোগ করে লাভ কি?”

ওই একটিমাত্র সড়ক ধরে যত গভীরে যাওয়া যাচ্ছে সাগরদিঘির, ততই গুমরোচ্ছে দুঃখ আর হতাশা। পাওয়া না পাওয়ার আক্ষেপ। তার মধ্যে চলছে উপনির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা। সমালোচনা। নির্বাচন নিয়ে ফিরে দেখা। পাল্টা মসকরাও।

চন্দনবাটি মোড়ে এসে যে জটলা বসেছিল বুধবার সকালে সেখানেও একই ছবি। ওই মোড়ে বেশ কয়েকটি দোকান আছে। কোনওটি খাবারের, কোনওটি অন্য সামগ্রীর কোনওটি মোবাইলের। তারমধ্যে একটিতে চপ, লুচি, মুড়ি বিক্রেতার সহায়ক হিসেবে কাজ করছে তার একমাত্র ছেলে। আগামীকাল যার মাধ্যমিক পরীক্ষা। নাম বলতে ইতস্তত সেই দোকানী কপট রেগে বললেন, “ বাড়িতে থাকলে মোবাইল নিয়ে নাড়াঘাটা করবে। লেখাপড়া তো করেই না। তাই আমি না থাকলে দোকান সামলাতে বলেছি।” কাল থেকে মাধ্যমিক শুনে মসকরার ছলে আর এক গ্রামবাসি পরীক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ও চপ, সিঙারা, মুড়ি কিভাবে বিক্রি করবে তাই লিখে আসবে।”

vote
রাজনৈতিক দলের পতাকা আর হোর্ডিংয়ে সেজেছে সাগরদিঘি।

কথায় কথায় ফেরে উপনির্বাচন। তার মাঝখানে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর ফুট কাটল “আমাদের সাগরদিঘি এখন যেন ভিআইপি। কত লোক এখন প্রতিদিন আসছে আর যাচ্ছে।” এই উপনির্বাচনের প্রচারে রাজ্যের হেভিওয়েট নেতারা এখানে এসেছেন, একথা ঠিক। ওই পরীক্ষার্থীর বাবা বললেন, “আমার ৫২ বছর বয়স। কিন্তু উপনির্বাচন নিয়ে এমন উৎসাহ রাজনৈতিক দলগুলির দেখি নি। এমনকি প্রণববাবু যেবার নির্বাচনে দাঁড়ালেন সেবারও না।”

ওই রাস্তা ধরে রঘুনাথগঞ্জের দিকে যত এগিয়ে যাওয়া যায় তত ভিড় বাড়তে থাকে মানুষজনের। ব্যস্ততাও। ইতি উতি দলীয় পতাকায় সাজানো হয়েছে রাস্তাঘাট। অথচ কোথাও নেই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি শুভেচ্ছা বার্তাও। সন্তোষপুর, হাসপাতাল মোড়, পার করে রতনপুর পেরিয়ে যতদূর যাওয়া যায় সর্বত্র একটাই আলোচনা উপনির্বাচন। সন্তোষপুর মোড়ের কাছে এক ব্যাগ ব্যবসায়ী রকি বলছেন, “ একুশের নির্বাচনের প্রচারে কংগ্রেস এমন জোড়ালো আবেদন রাখতে পারে নি। কিন্তু উপনির্বাচনে দেখছি হেভি প্রচার করছে ওরা।” যদিও তাঁর বাড়ি নবগ্রামে। তারই পাশে বসা বন্ধু জুয়েল মন্ডল বলছেন, “ তৃণমূল, বিজেপিও পিছিয়ে নেই। রোজ রোজ কত নেতারা এসে বোঝাচ্ছেন কেন তাঁদেরকেই ভোট দিতে হবে।” তাঁদেরকেও স্মরণ করাতে হল কাল মাধ্যমিক। পরীক্ষা গৌণ নির্বাচনই মুখ্য সাগরদিঘিতে।