জেলা কমিটি নিয়ে মুখোমুখি তাহের শাওনী সংঘাত

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ দুধ ফুটে ক্ষীর হওয়ার আগেই ছানা কেটে গেল। মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের অধরা পুর্নাঙ্গ জেলা কমিটি ঘোষণা হওয়ার আগে চেয়ারম্যান ও সভাপতির মধ্যে জিইয়ে থাকা অম্ল মধুর সম্পর্কের জেরেই অঘটন ঘটল। এমন দাবি করছেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতাদের কেউ কেউ। তাঁরা বলছেন, “ আবডালে রাখা দলের বহরমপুর সাংগঠনিক জেলার দুই শীর্ষ নেতার ছেঁড়া সম্পর্ক এতদিনে সামনে এল।” দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশমতো “ঐক্যমতে” বুধবার জেলা কমিটি ঘোষণা করার আগেই তালিকা “না পসন্দ” বলে সাংবাদিক বৈঠক ছেড়ে চলে গেলেন চেয়ারম্যান তথা সাংসদ আবু তাহের খান। তৎক্ষণাত তাঁর পিছু ধরেন তাঁর গোষ্ঠীর কেউ কেউ। তৃণমূলের জেলা কার্যালয়ে জনা কয়েক নেতা ও বিধায়ক নিয়ে এরপর কমিটি ঘোষণা করেন সভাপতি শাওনী সিংহরায়।
দলের উপর তলার দুই শীর্ষ নেতার এহেন আচরণ দেখে সাময়িক বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন কার্যালয়ে উপস্থিত নেতা কর্মীদের অনেকেই। তাঁদের কেউ কেউ ক্ষোভের সুরে জানালেন, “ এদের এই কোন্দলই ছড়িয়েছে দলের একেবারে তৃণমূল স্তরে।” আর তাই “বুথে বুথে তৃণমূলের শতদল। ঐক্যের বদলে অনৈক্যই এ দলে দস্তুর”, বক্রোক্তি নয়া কমিটিতে ঠাঁই না পাওয়া এক উঠতি নেতার। তাঁর দাবি, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগেই দল ছাড়বেন অনেকে। সে কথা তিনি হলফ করেই বলছেন বলে দাবিও করলেন। তাঁর কথায় সায় দিয়ে তৃণমূলের এক পুরনো নেতা বললেন, “ ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে কারা প্রার্থী হবেন এই কমিটি থেকে তা পরিস্কার। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ভালো মন্দের বাইরে দলের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করেন না। নিরপেক্ষে নির্বাচন হলে তার প্রভাব পড়বে সামনের পঞ্চায়েত নির্বাচনেই।”
কিন্তু ২৪৪ জনের সেই কমিটির কে কোথায় আছেন? শাওনী ঘোষিত সেই কমিটিতে পদাধিকার বলে আমন্ত্রিত সদস্য হয়েছেন ৭০ জন তৃণমূল নেতা। তাঁদের মধ্যে ১১ জন বিধায়ক, জেলা সভাধিপতি সামসুজ্জোহা বিশ্বাস ছাড়াও আছেন রাজ্য সহ সভাপতি মইনুল হাসান, প্রাক্তন জেলা সভাপতি অশোক দাস, জেলার পুরপ্রধানদের একমাত্র নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়। এছাড়া জেলা পরিষদের সব কর্মাধ্যক্ষ ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা।
কিন্তু মুর্শিদাবাদ জেলায় একটিই জেলা পরিষদ। সেখানে ৯ জন কর্মাধ্যক্ষ ও ২৬ জন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মিলিয়ে মোট ৩৫ জন সদস্য। বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার ভাগে তারমধ্যে আছেন ২০ জন। যেহেতু সে কথার উল্লেখ কমিটিতে নেই ফলে সকল কর্মাধ্যক্ষ ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পদাধিকার বলে বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার পদাধিকারী কি না তা খোলসা করেন নি কেউ।
এছাড়াও ২০ জন নানান শাখা সংগঠনের প্রধানরা আছেন আমন্ত্রিত সদস্যের তালিকায়। আবার তাঁদের মধ্যে বহরমপুরের কাউন্সিলর আবুল কাউসার, প্রবীর ভট্টাচার্য, নাজিমুদ্দিন মন্ডলের নামের পাশে কোন শাখার তাঁরা প্রধান তার কোনও উল্লেখ নেই। সহ-সভাপতি হয়েছেন আট জন তৃণমূল নেতা। প্রাক্তন এক জেলা সম্পাদক বলেন, “আট জনের অনেককে আমি নিজেই চিনি না। তারা দলের কী কাজ করেছেন তাও জানি না।” ওই কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন ৩৯ জন। সম্পাদকের পদ পেয়েছেন ৮১ জন। ৪৬ জন তৃণমূল নেতা কর্মীকে জেলা কমিটির সাধারণ সদস্য হিসেবে বেছেছেন শাওনী। যদিও শাওনীর দাবি, এই তালিকা রাজ্য থেকে পাঠানো হয়েছে। সেই দাবি মানতে নারাজ নয়া কমিটিতে ঠাঁই না পাওয়া প্রাক্তন পদাধিকারিরা। তাহেরের দাবি, “ শেষ মূহুর্তে তালিকা প্রকাশ করার জন্য আমার হাতে তালিকা তুলে দেওয়া হয়। তার আগে এই তালিকা দেখিনি। কিন্তু একজন চেয়ারম্যান হিসেবে কমিটিগতভাবে জেলার নেতাদের কে কোথায় থাকবেন সেটা জানার অধিকার আছে বলে আমার মনে হয়। সেটা না জেনে এই কমিটির দায় নেওয়া ঠিক হবে না। এই তালিকার সঙ্গে আমি যেহেতু সহমত নই তাই উঠে চলে এসেছি।” জেলা সভাপতির প্রতি সৌজন্যের প্রশ্ন তুলে তাহের বলেন, “ আমার সঙ্গে সামান্যতম সৌজন্যবোধ নিয়ে ঘন্টাখানেক আগেও যদি আলোচনা করা হত তাহলে ঠিক হত।” শাওনী অবশ্য বলেন, “ আমরা যা করি তা সবাই মিলে আলোচনা করে করি। চেয়ারম্যান যে নাম দিয়েছেন সেগুলিও তালিকায় আছে।” এর খানিক পরে ফের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাহের দাবি করেন, “ একজন চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে অন্ধকারে রেখে এই তালিকা প্রকাশ করা ঠিক হয় নি। তাই এই তালিকা নিয়ে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাঁরা একটি দিক নির্দেশিকা দিয়েছেন। আগামী দিনে আলাপ আলোচনার মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটি গঠন হবে।” তবে চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের পাল্টা কোনও কথা বলতে রাজি হননি জেলা সভাপতি। দলের অন্যতম আমন্ত্রিত সদস্য অশোক দাস পরিস্থিতি দেখে বলেন, “ পদ ছাড়াই আমি দল করবো সে কথা দলকে জানিয়ে দিয়েছি।”