জীবনের টানে পর্যটন কেন্দ্র বিধায়কের বাড়ি, ছাইয়ের দড়ি পাকাচ্ছে সময়

বিদ্যুৎ মৈত্র, কান্দিঃ এ যেন কারও পৌষমাস তো কারও সর্বনাশ। একদিকে যখন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকদের প্রশ্নবাণে জেরবার বড়ঞার বিধায়ক, তখন তাঁর আন্দির বাড়ি হয়ে উঠেছে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। তার জেরে মাগগি গন্ডার বাজারে কারও কারও পকেটে আসছে বাড়তি দু-চার টাকাও। “এও তো উন্নয়ন” বলে হাওয়ায় কটাক্ষ ছুঁঁড়ছেন স্থানীয়রা। রঙ্গ তামাসায় ম ম করছে জীবনের পাড়া। সেই দলে আছেন জীবনের বাল্য বন্ধুদের অনেকেই।

এদিকে এমন পাঁকে আর কোনও তদন্তে পা পড়েছে কি না সিবিআই আধিকারিকদের, সে কথা মনে করতে পারছেন না আন্দিতে বিধায়ককে জেরা করতে আসা আধিকারিকদের কেউই। সেই এক পোশাক পড়ে ৫৮ ঘন্টা পার করেছেন তাঁরা। ঘামে ভেজা শরীরটা কাঁহাতক আর সঙ্গ দেবে? তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁফিয়ে উঠছেন জলপাই রাঙা পোশাক পড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরাও। কাঁধের ভারি  আগ্নেয়াস্ত্র যে নামিয়ে রেখে খানিক্ষণ জিরিয়ে নেবেন সে ভরসাও পাচ্ছেন না বেচারা। যদি তন্দ্রার সুযোগে বিধায়ক ফের কিছু অঘটন ঘটিয়ে ফেলেন! তবু ক্ষণিকের জন্য শিথিল হচ্ছে অতন্দ্র প্রহরা, সময়ে খাবার হয়ত খাচ্ছেন কিন্তু ক্লান্তিতে খিদেও শুকিয়ে যাচ্ছে।

তবে জীবনকৃষ্ণের দাদুর আমলের এই পুকুরে কিন্তু ফোন ফেলার মতো ঘটনা নতুন নয়। বড়ঞা ব্লকের ১৩টি গ্রাম পঞ্চায়েত আছে। তারমধ্যে সবলদহ গ্রাম পঞ্চায়েত একটি। সেই পঞ্চায়েতের তেলডুমা আর আন্দি পাশাপাশি দুটি গ্রাম। বিজেপি’র সংখ্যালঘু মোর্চার জেলা সভাপতি মনিরুল ইসলাম তেলডুমার বাসিন্দা। এদিন তিনি দাবি করেন, “ জীবনের যে পুকুর থেকে  হন্যে হয়ে মোবাইল খুঁজছেন সিবিআই আধিকারিকরা একইভাবে ছয়- সাতের দশকে ওই পুকুর থেকে সোনা উদ্ধার করেছিলেন আরএসপি নেতা কালোবরণ ঘোষ।” তিনি আরও বলেন, “ সাতকড়ি সাহা জীবনকৃষ্ণের দাদু। তাঁর কাছে অবৈধ সোনা গচ্ছিত ছিল। ধরা পড়ার ভয়ে সাতকড়ি ওই পুকুরে সোনা ফেলে দিয়েছিলেন। সেবারও পুকুরের জল ছেঁচে সোনা উদ্ধার হয়েছিল।” মণিরুলের বাড়ি জীবনকৃষ্ণের বাড়ি থেকে মাত্র ছ’কিলোমিটার দূরে। মণিরুল ২৬ বছর বড়ঞা ব্লকের আরএসপি’র নেতা ছিলেন। এদিন তিনি বলেন, “ কালোবরণ ঘোষের কাছে আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। তাঁর মুখেই এই ঘটনার কথা শুনেছি।”  সে কথা কতটা খাঁটি তা পরখ করার মত মানুষ অবশ্য ওই এলাকায় মেলে নি।

তবে শুক্রবার থেকে রবিবার রাত গড়িয়ে সোমবার সকাল হতে চলল যে বিধায়কের বাড়ি তল্লাশি করতে, সেই সিবিআই আধিকারিকদের একবার চোখের দেখা না দেখলে জীবন বৃথা! ইদানিং সংবাদমাধ্যমের দৌলতে সাত থেকে সত্তরের কাছে ইডি, সিবিআই মুখে মুখে ঘোরে। তাঁদেরকে চাক্ষুষ করতে ১৩ কিলোমিটার টোটো চেপে বন্ধু জুটিয়ে আন্দি যাচ্ছেন যাঁরা, কান্দি বাসস্ট্যান্ডে নেমে এমন দাবি করলেন তাঁরাই। তাঁদেরই একজন রবীন হালদারের দাবি, “ এই ফাঁকে জীবনের ঠাকুরদ্দার পুকুরটা সংস্কার করে দিল সিবিআই।” বিধায়কের বাড়ি দেখে ফিরে এসেছেন কাবিল শেখ। তিনি এদিন দাবি করলেন, “ বিধায়কের বাড়ির সামনের চায়ের দোকানদার তিন দিনে মাসের আয় করে ফেলেছেন।” তবে রাকিবুল ইসলামের দাবি অবশ্য অন্য। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “ এতদিন বিধায়ককে ঘিরে রাখতেন যে পুলিশ এদিন তাঁদের হম্বিতম্বির সামনে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। পুলিশ বিধায়কের বাড়ির ছায়ায় পর্যন্ত দাঁড়াতে দিচ্ছে না।”  এদিন স্থানীয় তৃণমুল নেতারা ভিড় করেছিলেন বিধায়কের বাড়ীর দরজার সামনে। সেই প্রসঙ্গ তুলে কান্দির বাসিন্দা অরুপ পাল বলছেন, “ কি কথা যে ওরা বিধায়ককে বলতে এসেছিল তা ওরাই জানে। আমার মনে হয় বিধায়কের পাশে থাকার বার্তাই দিতে এসেছিলেন ওরা।”

আপাতত জলে ডোবা একটি মোবাইল উদ্ধার হয়েছে। আর একটি আদৌ মিলবে কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশায় আধিকারিকরা স্বয়ং। তবে কতটা পাঁক খুঁড়লে মিলবে হারানো মুঠোফোন সে দিকেই হা পিত্যেশ অপেক্ষা পাঁচিলের ওপারে। এপারে এখন ছাইয়ের দড়ি পাকাচ্ছে সময়।