কতো কীর্তি কার্নিভালে ! কেমন হল বহরমপুরের পুজো কার্নিভাল ?

কথায় আছে আনলাকি থার্টিন। আর তাতেই যত বিপত্তি। প্রথমেই এসে পৌঁছল স্বর্গধাম সেবক সংঘ।ঢাক ঢোল সবই বাজল। নাচা গানা সব হলো, কিন্তু ঠাকুর কোথায়? সে তো কবেই বিসর্জন হয়েছে। তবে এ যে কার্নিভাল! রসিক দর্শক মুচকি হেসে মন্তব্য করেন সবই মায়া।


এরপর একে একে ১২টি প্রতিমা কার্নিভালের প্যারেডে অংশ নিল, যার অধিকাংশেরই এ বছরের পূজোয় খুব একটা বেশি হাঁকডাক ছিল না। আর কার্নিভাল দেখতে আশপাশের যে মানুষজন YMA এর মাঠে রথ দেখা আর কলা বেচার আশায় জমা হয়েছিলেন, তাঁরা কার্নিভালের শেষে ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি। অনেকেই বলেছেন, মায়ের পিছন দেখার জন্য এত কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মানুষের এই ক্ষোভ দৃষ্টি এড়াইনি দায়িত্বপ্রাপ্তদেরও। দর্শকদের এই মন্তব্য শুনে জিভ কেটেছেন তাঁরা। অদ্ভুত যুক্তি দিয়েছেন, প্রথম বছর তো! দেখবেন পরের বছর সব ঠিক হয়ে যাবে। সব ঠিক হবে কী হবে না তা সময় বলবে। মধ্যবঙ্গের প্রতিনিধিদের টুকরো কোলাজ নিয়েই এই বিশেষ প্রতিবেদন।


আজ দ্বাদশী। দুর্গা পুজো শেষ হয়েছে গত পরশু। তবে আজ বহরমপুর তথা জেলার মানুষ দেখল দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে এক নতুন আঙ্গিকের উচ্ছ্বাস অনুষ্ঠান। যার নাম দেওয়া হয়েছে দুর্গা পূজা কার্নিভাল ২০২২। মুর্শিদাবাদ জেলায় এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই কার্নিভাল। যদিও কলকাতায় বিগত বছর গুলিতে এই কার্নিভাল আয়োজিত হয়েছে। এবার সেই ঢঙেই জেলায় YMA ময়দানে অনুষ্ঠিত হল ‘দুর্গা পূজা কার্নিভাল ২০২২’।

পুজোর শেষ দুদিন আকাশ ছিল মেঘলা, হয়েছে দু’পশলা বৃষ্টিও। কিন্তু আজ অর্থাৎ কার্নিভালের দিন শহরের তাপমাত্রা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। রোদ মাথায় করে ঘামতে ঘামতে, টুপি-ছাতা নিয়ে মাঠে উপস্থিত ছিল প্রায় হাজার খানেক মানুষ। শহরের বিশেষ কিছু মন্ডপের প্রতিমাগুলি নিয়ে কার্নিভালে উপস্থিত ছিলেন পুজো কমিটির সদস্যরা। কেউ ট্র্যাক্টরে বা কেউ লরি করে নিয়ে এসেছেন তাঁদের প্রতিমা।


গোটা YMA মাঠ সাজানো হয়েছিল। তৈরি করা হয়েছিল একটি প্রকাণ্ড মঞ্চ। সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন জেলার মন্ত্রী, আমলা, বিধায়ক ও তাঁদের নিরাপত্তারক্ষীরা। কড়া পাহারায় ঘিরে ফেলা হয়েছিল গোটা ময়দান। মঞ্চ ও প্রায় গোটা মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন অজস্র সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার। আকাশে উড়ছিল ড্রোন।

মঞ্চের বাইরে বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অসংখ্য ঢাকি, জেলার রাইবেশে নৃত্যশিল্পীরা ও সঙ্গীত শিল্পীরা। এরকমই একজন ঢাকি হলেন ৬০ বছরের কালিপদ দাস। জেলার প্রান্তের জলঙ্গি ব্লকের সাগরপাড়া থেকে ঢাক কাঁধে করে এসেছেন তিনি। গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা তাঁর। তিনি বলেন, “সকালে উঠে খবর পেয়েই সাথে সাথে ঢাক নিয়ে রওনা দিই। বাসে করে আসতে অসুবিধা হলেও কিছু করার নেই। সরকারি প্রোগ্রামে আসতেই হয়।“ এই অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা করে তাঁকে কোন পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, “ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর থেকে আমরা মাসে এক হাজার টাকা পায়, যা মোট করলে বছরে হয় ১২০০০ টাকা। এই টাকা দেয় বলে সরকারের প্রোগ্রামে বাজাতে আসতে হয়।“

রাইবেশে শিল্পী আবু সালেহ উপস্থিত ছিলেন তাঁর দলবল নিয়ে, এসেছেন কান্দি খড়গ্রাম থেকে। জেলার একটি অন্যতম আর্টফর্ম হল রাইবেশে। আগে জমিদারদের লাঠিয়ালরা এই রাইবেশে খেলা দেখাতেন। এখন জমিদার যদিও নেই তবে টিকে আছে রাইবেশে। সেই রাইবেশের দল নিয়ে উপস্থিত ছিলেন আবু সালেহ। তিনি বলেন, “আমরা দেশ বিদেশে খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। এটাই আমাদের নেশা ও পেশা।“ গরমে ঘামতে ঘামতে বলেন তিনি।


YMA মাঠের ধোপঘাঁটির দিকের গেট দিয়ে প্রতিমা নিয়ে পুজো কমিটিগুলি প্রবেশ করে, ক্যাথলিক চার্চের সামনের গেট দিয়ে বেরোচ্ছিল। মাঠে একসাথে বাজছিল অনেক ঢাক। কার্নিভালে প্রতিমা নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল ১২টি পুজো কমিটি। তাঁরা মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিদের দিকে নমস্কার করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গঙ্গার দিকে।মাঠে ভিড় সামাল দেবার জন্য ছিল প্রচুর পুলিশ ও সিভিক বাহিনী। জেলার অন্যান্য প্রান্ত থেকে ভিড় সামাল দেবার জন্য এসেছিলেন অনেক সিভিক ভলেন্টিয়ার। তাঁদের মধ্যে কেউ বলেন সিভিক দিয়ে সব কাজ করায়, কিন্তু আমাদের যে টাকা দেয় তাতে সংসার চলে না।


যাঁদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল এই কার্নিভাল। মা মুখ ফিরিয়ে রইলেন তাঁদেরই দিকে। অনেকেই বলছিলেন এ কোন কার্নিভাল! বহরমপুর লালদীঘির বাসিন্দা রীনা ঘোষ বলেন তিনি খুবই আশাহত এই কার্নিভাল দেখে। মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহরমপুরের এই কার্নিভালে আয়োজন ছিল বিরাট। বাংলার দুর্গাপুজো এবার UNESCO দ্বারা সম্মানিত হয়েছে।সেই আনন্দেই সরকার তরফে এই কার্নিভালের আয়োজন করা হয়েছে।